হাতিরঝিলের ক্লু-লেস হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদঘাটন

হাতিরঝিলের ক্লু-লেস হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদঘাটন

অনলাইন ডেস্ক

সম্প্রতি হাতিরঝিলের লেক থেকে অজ্ঞাত এক যুবকের লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। মুখমণ্ডল, হাত, আঙ্গুল ও শরীরের বিভিন্ন স্থান বিকৃত থাকায় ফিংগার প্রিন্ট সংগ্রহের মাধ্যমেও পরিচয় সনাক্ত করা যায়নি লাশের পরিচয়।

অবশেষে ক্লু-লেস ওই হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদঘাটন করেছে পুলিশ। গ্রেফতার করা হয়েছে হত্যাকাণ্ডে জড়িত চারজন ব্যক্তিকে।

ডিসি-তেজগাঁও ডিএমপির ফেসবুক পেজে বিস্তারিত তুলে ধরা হয়েছে সেই রহস্য উদঘাটনের বর্ণনা, যা পাঠকদের জন্য তুলে ধরা হল।
 
গত ১২ অক্টোবর, ২০২০ সকাল ৭ ঘটিকায় হাতিরঝিল থানাধীন হাতিরঝিল লেকের মেরুল-বাড্ডা প্রান্তে অজ্ঞাতনামা এক যুবকের অর্ধগলিত লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। তার হাত পা রশি দিয়ে বাধা ছিল। বেডশিট-মশারি ও পলিথিনে মোড়ানো ছিল পুরো শরীর। মুখমন্ডল, হাত, আঙ্গুল ও শরীরের বিভিন্ন স্থান ছিল বিকৃত। যে কারণে ফিংগার প্রিন্ট সংগ্রহের মাধ্যমেও তার পরিচয় সনাক্ত করা যায়নি।

হাতিরঝিল লেকের যেস্থানে এ মৃতদেহটি ভেসে ছিল সেখান থেকে প্রায় ৫০ মিটার উত্তরে লেকের পানি ঘেষে পড়ে থাকা একটি ছেড়া কাগজে লেখা একটি মোবাইল নম্বরের সূত্র ধরে মৃত ব্যক্তির পরিচয় সনাক্তের পাশাপাশি হত্যাকাণ্ডে জড়িত আসামিদের গ্রেফতার করে হাতিরঝিল থানা পুলিশ।

মৃত ব্যক্তির নাম আজিজুল ইসলাম মেহেদী। বয়স ২৪ বছর। তিনি আন্তর্জাতিক ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয় চট্টগ্রামের ইংরেজি বিভাগের মাস্টার্সের ছাত্র ছিলেন। আমেরিকা প্রবাসী বাবার একমাত্র ছেলে। আজিজুল ইসলাম মেহেদীর জন্ম চট্টগ্রাম জেলার সন্দীপের বাউরিয়া গ্রামে হলেও বেশ কয়েক বছর ধরে মাকে নিয়ে চট্টগ্রামের ফিরোজ শাহ এলাকায় থাকতেন তিনি। লেখাপড়া শেষ করে কানাডায় যাওয়ার ইচ্ছা ছিল তার। লেখাপাড়ার পাশাপাশি পরিচিতজনদের পাসপোর্ট ও ভিসা প্রসেসিংয়ে সহায়তা করতেন মেহেদী।

১৩ অক্টোবর, ২০২০ তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল জোনের এডিসি হাফিজ আল ফারুকের নেতৃত্বে এসি আশিক হাসান, হাতিরঝিল থানার অফিসার ইনচার্জ আব্দুর রশীদ, ইন্সপেক্টর মহিউদ্দিন, এসআই  আতাউল ও এএসআই তরিকুল ইসলামের একটি টিম  রাত ০১ টা ২০ মিনিট থেকে ভোর ০৬টা ৪০ মিনিট পর্যন্ত খিলক্ষেত থানাধীন উত্তরপাড়া এলাকা থেকে এ হত্যাকাণ্ডে জড়িত আসামি আহসান ও তামিম, হাতিরঝিল থানাধীন মহানগর আবাসিক এলাকা থেকে আলাউদ্দিন এবং রামপুরা এলাকা থেকে রহিমকে গ্রেফতার করে।

গ্রেফতারকৃত আহসান, আলাউদ্দিন ও রহিম আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে।

গ্রেফতারকৃত আহসান জন্ম চট্টগ্রাম জেলার সন্দীপের বাউরিয়া গ্রামে। সে নিহত আজিজুল ইসলামের বাল্যবন্ধু। পাঁচ বছর মালেশিয়ায় থেকে ডিসেম্বর, ২০১৯ এ বাংলাদেশে ফেরে আহসান। মার্চ, ২০২০ এ ঢাকার গুলশান ২ এ অবস্থিত ‘দ্য গ্রোভ’ রেস্টুরেন্টে মাসিক ৬৫,০০০ টাকা বেতনে এক্সিকিউটিভ শেফ হিসেবে যোগদান করে আহসান। তবে করোনায় রেস্টুরেন্ট বন্ধ হয়ে যাওয়ায় আর্থিক সংকটে পড়ে আহসান। তখন সে তার স্ত্রীর আত্মীয় এ হত্যাকাণ্ডে জড়িত অপর আসামি আলাউদ্দিনের কাছে কিছু টাকা ধার চায়।

আলাউদ্দিন পেশায় ড্রাইভার হলেও পাসপোর্ট অফিসে দালালী ও পরিবহন পুলের পুরাতন গাড়ি ক্রয়-বিক্রয়ের সঙ্গে জড়িত ছিল। আলাউদ্দিন আহসানকে টাকা ধার না দিয়ে পাসপোর্ট সংক্রান্ত কাজ (নামের বানান সংশোধন, জন্ম তারিখ সংশোধন, বয়স বাড়ানো কমানো) দিতে বলে। এ কাজে যে টাকা পাওয়া যাবে তা দু’জনে ভাগ করে নেবে।

আহসান বাল্যবন্ধু আজিজুল ইসলাম মেহেদীকে জানায় পাসপোর্টে সমস্যা সংক্রান্ত কোনও কাজ থাকলে সে সমাধান করে দিতে পারবে।

চট্টগ্রামের তিনটি পাসপোর্টের নাম ও বয়স সংশোধনের জন্য ১২ আগস্ট, ২০২০ এ ঢাকায় আহসানের কাছে আসে মেহেদী। মেহেদী আলাউদ্দিনকে এ বিষয়টি জানালে আলাউদ্দিন তার গাড়িতে আহসান ও মেহেদীকে মহানগর আবাসিক এলাকায় অবস্থিত তার বাসায় নিয়ে যায়। দুই সপ্তাহের মধ্যে পাসপোর্ট তিনটির নাম ও বয়স সংশোধন করে দেওয়ার বিনিময়ে আলাউদ্দিনকে ১ লাখ ৮০ হাজার টাকা ও আহসানকে ১ লাখ টাকা দেয় মেহেদী।

আগারগাঁও পাসপোর্ট অফিসে কর্মরত উচ্চমান সহকারী পদমর্যাদার এক ব্যক্তিকে আর্থিক সুবিধা প্রদানের মাধ্যমে  পাসপোর্টে নাম ও বয়স সংশোধনের কাজ করতো আলাউদ্দিন। পাসপোর্ট তিনটি সংশোধনের জন্য পাসপোর্ট অফিসের সেই ব্যক্তিকে দিলেও নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সে কাজ কতে দিতে পারেনি। আহসান ও আলাউদ্দিনকে এজন্য চাপ দেয় মেহেদী। পরবর্তীতে আহসান ও আলাউদ্দিন মেহেদীর কাছে এক সপ্তাহ সময় চেয়ে নেয়। এই সময়েও পাসপোর্ট সংশোধনের কাজ করতে ব্যর্থ হওয়ায় আলাউদ্দিন ও আহসানের কাছে পাসপোর্ট ও টাকা ফেরত চায় মেহেদী।

আহসান ও আলাউদ্দিন পাসপোর্ট ও টাকা ফেরত না দিয়ে সময় ক্ষেপণ করতে থাকে। একপর্যায়ে মেহেদী এ দুজনকে জানায় পাসপোর্ট ও টাকা ফেরত না দিলে ঢাকায় এসে তাদের অফিসে অভিযোগ করবে। চাকরি হারানোর ভয়ে আহসান ও আলাউদ্দিন মেহেদীকে হত্যা করার পরিকল্পনা করে। এ পরিকল্পনার অংশ হিসেবে আহসান ও আলাউদ্দিন পাসপোর্ট নেওয়ার জন্য মেহেদীকে ১০ অক্টোবর, ২০২০ এ ঢাকায় আসতে বলে।

১০ অক্টোবর, ২০২০ রাত ১১টা ১০ মিনিটে চট্টগ্রাম থেকে ঢাকায় এসে পৌঁছে মেহেদী। হত্যাকাণ্ডের পরিকল্পনা মোতাবেক আহসান মেহেদীকে খিলক্ষেত উত্তরপাড়ায় অবস্থিত তার ভাড়া বাসায় নিয়ে যায়। খাবারের সাথে ঘুমের ওষুধ খাওয়ানো হয় মেহেদীকে। রাত আনুমানিক ০১টা ৩০ মিনিটে ঘুমন্ত মেহেদীকে শ্বাসরুদ্ধ করে হত্যা করে মেহেদীর হাত, পা রশি দিয়ে শক্ত করে বেধে বেডশিট, মশারি ও পলিথিনে মুড়িয়ে ফেলে মোবাইল ফোনে আলাউদ্দিনকে হত্যার পর বিষয়টি কনফার্ম করে আহসান।

উল্লেখ্য ৮ অক্টোবর, ২০২০ এ আলাউদ্দিন পেশাগত কাজে সিলেটে যায়। নিজেকে সন্দেহের বাইরে রাখতে ঢাকার বাইরে অবস্থাকালীন সময়ে মেহেদীকে হত্যার পরিকল্পনা করে আহসানের মাধ্যমে মেহেদীকে ঢাকায় আসতে বলে আলাউদ্দিন।

আহসানের পাশের রুমের ভাড়াটিয়া তামিম (‘দ্য গ্রোভ’ রেস্টুরেন্টে কর্মরত কলিগ) আকস্মিকভাবে আহসানের রুমে ঢুকে হত্যাকাণ্ডের বিষয়টি জানতে পারে। আহসানের অনুরোধের প্রেক্ষিতে তামিম জানায় বিষয়টি সে কাউকে বলবে না এবং লাশটি সুবিধাজনক স্থানে ফেলে দিতে আহসানকে সহায়তা করবে।

লাশ সরিয়ে ফেলার জন্য ভোর চারটার দিকে আলাউদ্দিন খিলক্ষেত উত্তরপাড়ায় আহসানের বাসায় গাড়ি পাঠায়। আহসান ও তামিম ড্রাইভারকে গাড়িতে বসতে বলে নিজেরাই মালামাল গাড়িতে তুলবে জানালে ড্রাইভার তাদের মালামাল গ্রহণে অস্বীকৃতি জানায়। পাশাপাশি ফজরের নামাজ শেষ হওয়ায় লোক সমাগম বেড়ে যাওয়ায় গাড়ি ছেড়ে দেয় আহসান।

লাশ বিছানার নিচে রেখে দুপুর ১২টার দিকে ‘দ্য গ্রোভ’ রেস্টুরেন্টে ডিউটিতে যায় আহসান ও তামিম। কাজ শেষে দু’জন একসাথে বাসায় ফেরে। রাত একটার দিকে আলাউদ্দিনের নির্দেশে ড্রাইভার রহিম আলাউদ্দিনের নেওয়া মাইক্রোবাসটি চালিয়ে লাশ ফেলে দেওয়ার জন্য খিলক্ষেত উত্তরপাড়ায় আহসানের বাসায় যায়।

আহসান ও তামিম বিছানা, মশারি, বেডশীট ও পলিথিনে মোড়ানো মেহেদীর লাশটি মাইক্রোবাসে উঠিয়ে ড্রাইভার রহিমকে সায়েদাবাদে যেতে বলে। পথে তামিম নেমে যায়। আহসান মাইক্রোতে লাশটি নিয়ে হাতিরঝিল এলাকায় প্রবেশ করে। হাতিরঝিল লেকের মেরুল-বাড্ডা প্রান্তে লোকজনবিহীন ও অন্ধকারচ্ছন্ন দেখে ড্রাইভার রহিম গাড়ি থামিয়ে দরজা খুলে দেয়। আহসান লাশটি গাড়ি থেকে পানিতে ফেলে দেয়।

গ্রেফতারকৃত আসামিদের কাছে তিনটি পাসপোর্ট, চট্টগ্রাম থেকে ঢাকায় আসার জন্য ব্যবহৃত মেহেদীর বাস টিকিট জব্দ করা হয়েছে। পাশাপাশি যে মাইক্রোবাসটি ব্যবহার করে মেহেদীর লাশ হাতিরঝিলে ফেলে দেওয়া হয়েছে, সেই মাইক্রোবাসটিও জব্দ করা হয়েছে।

এ বিষয়ে তেজগাঁও বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ হারুন অর রশীদ বিপিএম (বার), পিপিএম (বার) জানান- ‘এটি একটি ক্লু-লেস হত্যাকাণ্ড। ফিঙ্গারপ্রিন্টের মাধ্যমে লাশের পরিচয় যাতে সনাক্ত করা না যায় সেজন্য হাতের আঙ্গুল বিকৃতকরণের পাশাপাশি মুখমণ্ডলও বিকৃত করে খুনিরা। যেখানে লাশ ফেলেছিল সেখান থেকে ৫০ মিটার দূরে পাওয়া একটি ছেড়া কাগজে লেখা একটি মোবাইল নম্বরের সূত্র ধরে লাশের পরিচয় সনাক্তকরণের পাশাপাশি হত্যাকাণ্ডে জড়িত চারজন আসামিকে গ্রেফতার ও সব আলামত উদ্ধার করতে সক্ষম হয়েছি আমরা। পুলিশি তদন্তের উৎকর্ষতার প্রমাণ এই মামলাটি’।

pbnews/nk

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *




পর্তুগাল বাংলানিউজ

প্রধান উপদেষ্টা: কাজল আহমেদ

পরিচালক: মোঃ কামাল হোসেন, মোঃ জহিরুল ইসলাম

প্রকাশক: মোঃ এনামুল হক

যোগাযোগ করুন

E-mail : portugalbanglanews24@gmail.com

Portugalbanglanews.com 2019
Developed by RKR BD