স্বাস্থ্য খাতে শহীদ জিয়ার দূরদর্শী অবদান | ডা. তাসলিমা ইসলাম

পর্তুগাল বাংলা নিউজপর্তুগাল বাংলা নিউজ
  প্রকাশিত হয়েছেঃ  ০৪:৪১ PM, ২৯ মে ২০২৪

স্বাধীনতার মহান ঘোষক শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান “স্বাস্থ্যই সকল সুখের মূল” প্রবাদের মর্মার্থ বুঝেছিলেন। স্বাস্থ্য ব্যবস্থার উন্নতি ছাড়া অন্যান্য ক্ষেত্রে উন্নতি হলেও এ জাতির মানুষ প্রকৃত সুখি হবে না। সুস্থ শরীর ও সুস্থ মন ছাড়া মানুষ উন্নত চিন্তা করতে পারে না। এসব কারণ বিবেচনায় নিয়ে তিনি স্বাস্থ্য খাতে মনোযোগ দিয়েছিলেন। শহীদ জিয়ার ঐতিহাসিক ১৯ দফার মধ্যে ১০ম দফা হল “দেশবাসীর জন্য নূন্যতম চিকিৎসার বন্দোবস্ত করা” যা তিনি বাস্তবে করে দেখিয়েছেন। স্বাধীনতার পরপরই অপুষ্টি, জন্মহার বৃদ্ধি, গুটি বসন্ত, ডায়রিয়া, কলেরা ও অন্যান্য জলবাহিত রোগের প্রাদুর্ভাবে জনস্বাস্থ্য কাঠামো ভেঙে পরেছিল যার প্রতি দ্রুত মনোযোগ দিয়েছিলেন তৎকালীন রাষ্ট্রপতি শহীদ জিয়া। সব মিলে ৬ বছরের শাসনকালে উনি রাষ্ট্রের অর্থনীতির রাজনীতি ও পররাষ্ট্রনীতি সংস্কার করতে অধিকাংশ সময় চলে যায়। তারপরেও স্বাস্থ্য খাতকে গুরুত্বপূর্ণ ভেবে তিনি অনেক দূরদর্শী ও বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করেছেন। আজ ৩০ মে ২০২৪ ইং তারিখে ৪৩তম শাহাদাত বার্ষিকী স্মরণে বিনম্র শ্রদ্ধায় নিম্নে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়কে উপস্থাপন করছি।

১. বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সাথে সমন্বয় করন: প্রেসিডেন্ট জিয়া বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার গৃহীত বাংলাদেশের প্রযোজ্য সকল পদক্ষেপ বাস্তবায়নের জন্য অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন।  প্রাথমিক স্বাস্থ্য পরিচর্যা বিষয়ক “আলমা -আতা ঘোষণা”  স্বাক্ষরিত হয় ১৯৭৮ সালে।‌ বর্তমান কাজাখস্তানের রাজধানী আলমা আতায় বিশ্বের ১৩৪টি রাষ্ট্রের রাষ্ট্রের শীর্ষ নেতাদের এক সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। সেই ঘোষণায় বাংলাদেশ ও স্বাক্ষরকারী দেশ। ২০০০ সালের মধ্যে “সবার জন্য স্বাস্থ্য” এই স্লোগানটি সেখান থেকেই প্রবর্তিত হয়েছিল। প্রেসিডেন্ট জিয়া এই ঘোষনার গুরুত্ব বুঝতে পেরে বাংলাদেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় গণমানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার একটি উজ্জ্বল মডেল সৃষ্টি করেন।

২. জনসংখ্যা ব্যবস্থাপনা: শহীদ জিয়া যুদ্ধত্তোর বাংলাদেশে জনসংখ্যাকে অন্যতম সমস্যা হিসেবে বিবেচনা করলেন। বিশাল এই জনসংখ্যাকে কিভাবে জনশক্তি রূপান্তর করা যায় সেই পরিকল্পনা করলেন।‌ একদিকে পরিবার পরিকল্পনা পদ্ধতি গ্রহণ করার মাধ্যমে জন্ম হারকে করলেন নিয়ন্ত্রণ অন্যদিকে মধ্যপ্রাচ্য বিশেষত সৌদি আরবে  দক্ষ অদক্ষ জনশক্তি রপ্তানি করে বৈদেশিক মুদ্রা আয় করলেন। “প্রতিবছর সন্তান নয় দুটি হলে আর নয়”,  “ছেলে হোক মেয়ে হোক দুটি সন্তানই যথেষ্ঠ” স্লোগানকে জনপ্রিয় করে “আমাদের সুখী পরিবার” গঠনে উৎসাহিত করেন। ১৯৭৭ সালে প্রথম চাঁদপুর মতলবে “মাতৃ ও শিশু স্বাস্থ্য এবং পরিবার পরিকল্পনা” বিষয়ক কর্মসূচীর উদ্বোধন হয়। জনসংখ্যা ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে তিনি জনস্বাস্থ্যের উন্নতি ঘটালেন। পরিবার পরিকল্পনাকে জনপ্রিয় করার জন্য ১২০০০ কর্মকর্তা নিয়োগ করেছিলেন। তিনি “ক্যাফেটোরিয়া অ্যাপ্রোচ” ব্যবহার করে এক জায়গায় বিনামূল্যে সকল ধরনের গর্ভনিরোধক সামগ্রী বিতরণ করার ব্যবস্থা করেছিলেন যা অত্যন্ত ফলপ্রসূ হয়েছিল।

৩. ডায়রিয়া/কলেরা নিয়ন্ত্রণ: সত্তরের দশকে কলেরা একটি মারাত্মক মহামারী রোগ ছিল যার ফলে হাজার হাজার মানুষ অকালে মারা গিয়েছে। কলেরার প্রাদুর্ভাগ নিয়ন্ত্রণের জন্য ১৯৭৮ সালে একটি অধ্যাদেশের মাধ্যমে তিনি “ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর ডায়রিয়াল ডিজিজ রিসার্চ বাংলাদেশ (আইসিডিডিআর,বি) প্রতিষ্ঠা করে দেশি-বিদেশী গবেষকদেরকে নিয়ে নিজে উদ্বোধন করলেন।। কলেরা ও ডায়রিয়া নিয়ন্ত্রণে গবেষকদের তত্ত্বাবধানে খাবার স্যালাইন এর ব্যবহার পরীক্ষামূলকভাবে বৃদ্ধি করলেন এবং সফল হলেন। প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের অনুমোদনক্রমে মতলবে স্থানীয় বাজার থেকে চিনি, খাবার সোডা, পটাশিয়াম লবণ সংগ্রহ করে সেখানেই ওরস্যালাইন তৈরী করে রোগাক্রান্তদের মাঝে বিতরণ করা হয়। ১৯৮০ সালের ফেব্রুয়ারিতে “জার্নাল অব ট্রপিক্যাল মেডিসিন এন্ড হাইজিন” এ প্রকাশিত রিপোর্ট মতে  এই ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল চলা অবস্থায় ডায়রিয়ার রোগ জীবাণু নিয়ে হাসপাতালে ভর্তির সংখ্যা আগের তুলনায় ২৯ শতাংশ কমে যায়। আজকাল ওরস্যালাইন ডায়রিয়ায় পানি শূন্যতা সহ বিভিন্ন কাজে বহুল ব্যবহৃত হচ্ছে । আজ আইসিডিডিআর,বির জটিল সংক্রমণ রোগ প্রতিরোধ চিকিৎসা ও নির্মূল গবেষণা আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পেয়েছে।

৪. গণটিকা কর্মসূচি: প্রেসিডেন্ট জিয়া ইমিউনাইজেশন সম্প্রসারিত কর্মসূচি বা ইপিআই এর মাধ্যমে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার বৈশ্বিক উদ্যোগ গণটিকাদান কার্যক্রমকে ত্বরান্বিত করেছিলেন। যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশে কয়েক বছরের মধ্যে শিশুদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ৬টি টিকা যেমন বিসিজি, ডিপিটি, ওপিভি, টিটি, হাম ও পোলিও অত্যন্ত সফলভাবে ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল। ১৯৭৯ সালে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান জারিকৃত এক অধ্যাদেশের সুফলে নবজাতকের মৃত্যুর হার কমাতে আইসিডিডিআর,বির গবেষকরা তৈরী করে “টিটেনাস টিকা” যার ফলে নবজাতকের মৃত্যুর হার ৭৫ শতাংশ কমেছিল। আজ বিশ্ব স্বাস্থ্যসংস্থা ও ইউনিসেফের উদ্যোগে মা ও শিশু স্বাস্থ্যসেবা “টিটেনাস টিকা” কর্মসূচী বিশ্বের অর্ধেকের বেশি দেশে সুফল ভোগ করছে।

৫. স্বাস্থ্য প্রশাসন সম্প্রসারণ: প্রেসিডেন্ট জিয়া মেডিকেলের মেধাবী শিক্ষার্থীদেরকে সরকারি চাকরিতে আকর্ষণ বাড়ানোর জন্য সরকারি চাকরি তথা বিসিএসে হেলথ ক্যাডার যুক্ত করেছেন। পল্লী অঞ্চলে সেবা সম্প্রসারণের জন্য চীনে ব্যাপক প্রচলিত “বেয়ারফুট ডক্টর মডেল” অনুসরণে সারা দেশে ২৭,৫০০ পল্লী চিকিৎসক নিয়োগ দেন। প্রেসিডেন্ট জিয়া ১৯৭৭ সালে জাতীয় জনসংখ্যা গবেষণা ও প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। স্বাস্থ্য সেবা ও পরিবার পরিকল্পনা সেবাকে সমন্বিত করার জন্য সারাদেশে প্রতিটি ইউনিয়নে একটি করে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করেন। বিভিন্ন ইউনিটে বিভক্ত করেন, কর্মী নিয়োগ দেন।‌ এখাতে অবকাঠামগত নানা রকম উন্নতি সাধন করেন। জাতীয় ক্যান্সার হাসপাতাল, নিটোর, নিপসম, হৃদরোগ ইনস্টিটিউট, চক্ষু বিজ্ঞান ইনস্টিটিউট সহ নার্সিং সার্ভিস ও মেডিকেল এসিস্ট্যান্ট ট্রেনিং সেন্টার বা ম্যাটস প্রতিষ্ঠা করেন। প্যারামেডিক্স ও স্বাস্থ্যকর্মী প্রশিক্ষণ জোরদার সহ নতুন হাসপাতাল, মেডিকেল কলেজ স্থাপন ও আধুনিক চিকিৎসা সরঞ্জাম সংযোজন এর ব্যবস্থা করেন।

৬. স্বাস্থ্য সেবা বেসরকারিকরণ: উনি বুঝতে পেরেছিলেন ব্যাপক স্বাস্থ্য সেবা নিশ্চিত করতে হলে বেসরকারি বিনিয়োগ আগ্রহী করতে হবে এবং তিনি তাই করলেন। উনার বেসরকারিকরণ নীতির ফলে আজকের ল্যাব এইড, পপুলার, ইউনাইটেড, ইবনে সিনা প্রতিষ্ঠানগুলি হাজার হাজার মানুষের স্বাস্থ্য সেবা করে যাচ্ছে। লিব্রা, অপসোনিন, স্কয়ার আজ ওষুধ তৈরি ও বাজারজাতকরণে দেশের চাহিদা মিটিয়ে বিদেশেও রপ্তানি করছে।শহীদ জিয়া স্বাধীনতাত্তোর তলাবিহীন ঝুড়ি খেতাব পাওয়া রাষ্ট্রকে উৎপাদন বৃদ্ধি করে আত্মমর্যাদাশীল স্বনির্ভর রাষ্ট্রে পরিণত করেছিলেন। শহীদ জিয়ার আদর্শ, খালেদা জিয়ার আপোষহীন সংগ্রাম আর তারুণ্যের অহংকার তারেক রহমানের  নেতৃত্বে এগিয়ে যাবে আগামীর বাংলাদেশ। শহীদ জিয়া অমর হোক। খালেদা জিয়া-জিন্দাবাদ। বাংলাদেশ-জিন্দাবাদ।

লেখক : স্বাস্থ্য বিষয়ক সম্পাদিকা,

ঢাকা মহানগর দক্ষিণ, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী মহিলা দল এবং

সদস্য – ডক্টরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ড্যাব)।

আপনার মতামত লিখুন :