বর্ষীয়ান ও রাজনীতিবিদ  অধ্যাপক মোজাফফর আহমেদ আইসিইউতে

বর্ষীয়ান ও রাজনীতিবিদ অধ্যাপক মোজাফফর আহমেদ আইসিইউতে

দেবিদ্বার থেকে সোহেল আহমদঃ ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টির (ন্যাপ) সভাপতি ও মুক্তিযুদ্ধকালীন প্রবাসী সরকারের একমাত্র জীবিত উপদেষ্টা এবং কুমিল্লার দেবিদ্বারের কৃতি সন্তান ,দেশ বরেণ্য রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব অধ্যাপক মোজাফফর আহমেদর অবস্থা সংকটাপন্ন। গুরুতর অসুস্থ অবস্থায় রাজধানীর অ্যাপোলো হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন বর্ষীয়ান এই রাজনীতিবিদ। 

চিকিৎসকরা বলেছেন, অধ্যাপক মোজাফফর আহমদ বার্ধক্যজনিত কারণে গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। তার শরীরের অক্সিজেন কমে গেছে, প্রেশারও অনেক বেশি ওঠানামা করছে। তবে পরিবারের সদস্য ও রাজনৈতিক সহকর্মীদের ডাকে মৃদু সাড়া দিচ্ছেন তিনি। এখনও অনেককে চিনতে পারছেন। ন্যাপের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক ইসমাইল হোসেন জানান, শারীরিক অবস্থার গুরুতর অবনতি ঘটায় মোজাফফর আহমদকে ১৪ আগস্ট হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। বর্তমানে তাকে আইসিইউতে রাখা হয়েছে। ৯৭ বছর বয়সী এই রাজনীতিবিদের শারীরিক অবস্থা সংকটাপন্ন বলে জানিয়েছেন চিকিৎসকরা।

গত বেশ কয়েক বছর ধরেই অসুস্থ অবস্থায় রাজধানীর বারিধারায় মেয়ের বাসায় দিন কাটাচ্ছিলেন অধ্যাপক মোজাফফর আহমদ। এদিকে গত বুধবার বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারা অধ্যাপক মোজাফফর আহমদকে দেখতে হাসপাতালে যান। তাদের মধ্যে ছিলেন ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন এমপি, জাসদের সভাপতি হাসানুল হক ইনু এমপি, সাম্যবাদী দলের সাধারণ সম্পাদক দিলীপ বড়ূয়া, সিপিবির সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ শাহ আলম, প্রেসিডিয়াম সদস্য আবদুল্লাহ কাফী রতন। এ সময় তার চিকিৎসা ও শারীরিক অবস্থার খোঁজখবর নেন নেতারা। তার দ্রুত সুস্থতাও কামনা করেন তারা।

জন্ম ও শিক্ষা জীবনঃ
মোজাফফর আহমদ ১৯২২ সালের ১৪ এপ্রিল কুমিল্লা জেলার দেবিদ্বার উপজেলার এলাহাবাদ গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতার নাম আলহাজ কেয়াম উদ্দিন ভূইয়া, মায়ের নাম আফজারুন্নেছা। তাঁর পিতা ছিলেন একজন স্কুল শিক্ষক। মোজাফফর আহমদ যথাক্রমে স্থানীয় হোসেনতলা স্কুল ও গঙ্গামন্ডল (জাফরগঞ্জ) রাজ ইনস্টিটিউশনে প্রাথমিক, দেবিদ্বার রেয়াজউদ্দিন পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়ে মাধ্যমিক এবং ভিক্টোরিয়া কলেজে উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ে পড়াশোনা করেন। পরবর্তীতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে সম্মানসহ স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি গ্রহণ করেন এবং ইউনেস্কো থেকে একটি ডিপ্লোমা লাভ করেন। 

কর্মজীবন ও রাজনীতিতে যোগদানঃ
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃতী ছাত্র জনাব মোজাফফর আহমদ দীর্ঘদিন বিভিন্ন কলেজে শিক্ষক করেন। শেষমেশ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগে অধ্যাপনা করেন ১৯৫২ থেকে ১৯৫৪ সাল পর্যন্ত। তাঁর রাজনৈতিক জীবন অত্যন্ত বর্ণিল। রাজনীতি অঙ্গনে তাঁর শুভসূচনা হয় ১৯৩৭ সালের দিকে। তিনি ১৯৫২ সালের মহান ভাষা আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। ১৯৫৪ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির অধ্যাপনা ছেড়ে দিয়ে সম্পূর্ণভাবে রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়ে যান। ১৯৫৪ সালের সাধারণ নির্বাচনে নিজ জেলা কুমিল্লার দেবিদ্বার আসনে মুসলিম লীগের শিক্ষামন্ত্রীকে পরাজিত করে তাক লাগিয়ে দেন রাজনীতির ময়দানের সবাইকে। আওয়ামীলীগেরবিরোধিতা সত্ত্বেও ১৯৫৭ সালের ৩রা এপ্রিল পূর্ববঙ্গ প্রাদেশিক পরিষদে ন্যাপ এর প্রতিনিধি নেতা হিশেবে অধ্যাপক মোজাফফর আহমদ আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসনের প্রস্তাব উত্থাপন করেছিলেন। সামরিক শাসক আইয়ুব সরকার তার বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা ও হুলিয়া জারি করে ১৯৫৮ সালের দিকে। তাকে ধরিয়ে দিলে পুরস্কার প্রাপ্তির ঘোষণা পর্যন্ত করা হয়। আত্মগোপন থাকা অবস্থায় তিনি আইয়ুব সরকার শাসনের বিরুদ্ধে আন্দোলন সুসংগঠিত করেন। দীর্ঘ আট বছর সময়ব্যাপী আত্মগোপনে থাকবার পর ১৯৬৬ সালে তিনি প্রকাশ্য রাজনীতিতে প্রত্যাবর্তন করেন। ১৯৬৭ সালে পূর্ব পাকিস্তান ন্যাপের সভাপতি নির্বাচিত হন অধ্যাপক মোজাফফর আহমদ। অবিভক্ত পাকিস্তান ন্যাপের যুগ্ম সম্পাদকও ছিলেন তিনি। ১৯৬৯ সালে আইয়ুব সরকারবিরোধী আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়ে তিনি কারাবরণও করেছেন।

মুক্তিযুদ্ধে অবদানঃ
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে প্রবাসী বাংলাদেশ সরকার তথা মুজিবনগর সরকার ছয় সদস্যের যে উপদেষ্টা পরিষদ গঠন করেছিল, তাঁদের মধ্যে একজন ছিলেন অধ্যাপক মোজাফফর আহমদ এবং এই মুহূর্তে সে ছয়জনের মাঝে তিনিই একমাত্র জীবিত। উপদেষ্টা কমিটির অন্যান্য সদস্যদের মধ্যে ছিলেন মাওলানা ভাসানী, মণি সিংহ, মনোরঞ্জন ধর ও খোন্দকার মোশতাক আহমদ।[৩] তিনি স্বাধীনতার পক্ষে আন্তর্জাতিক সমর্থন আদায়ের লক্ষ্যে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে সফর করেন। সে সময় তিনি জাতিসংঘে বাংলাদেশ সরকারের প্রতিনিধিত্ব করেন। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন ন্যাপ, সিপিবি ও ছাত্র ইউনিয়ন থেকে নিজস্ব উনিশ হাজার মুক্তিযোদ্ধা সংগঠনে অধ্যাপক আহমদের ভূমিকা অবিস্মরণীয়।

স্বাধীন বাংলার রাজনীতিতে পদচারণঃ
স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে ১৯৭৯ সালে অধ্যাপক মোজাফফর আহমদ সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। পরে ১৯৯১ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে কুমিল্লার দেবিদ্বার আসন থেকে কুঁড়েঘর প্রতিকে নির্বাচন করেন। ওই নির্বাচনে তিনি বিএনপির প্রার্থী ইঞ্জিনিয়ার মঞ্জুরুল আহসান মুন্সীর নিকট হেরে যান। এর আগে ১৯৮১ সালে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন হলে তিনি ন্যাপ, সিপিবি এবং প্রগতিশীল শক্তির পক্ষে প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। স্বৈরাচারী শাসক এরশাদ-বিরোধী আন্দোলনের শুরুতে অধ্যাপক আহমদ কারারুদ্ধ হন। রাজনীতি জীবনে তিনি যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, ফ্রান্স, জার্মানি, সোভিয়েত ইউনিয়ন, বুলগেরিয়া, অস্ট্রিয়া, দক্ষিণ ইয়েমেন, লিবিয়া, আফগানিস্তান, ভারত, মধ্যপ্রাচ্যসহ পূর্ব ও পশ্চিম ইউরোপের নানান দেশে সফর করেন। ব্যক্তিগত জীবনে তিনি এক কন্যা সন্তানের জনক। সরকার ২০১৫ সালে অন্যদের সঙ্গে তাঁকেও স্বাধীনতা পদক দেওয়ার ঘোষণা দিলে তিনি সবিনয়ে তা নিতে অস্বীকার করেন। তাঁর মত হলো, রাজনীতির অর্থ দেশসেবা, মানুষের সেবা। পদ বা পদবির জন্য কখনো রাজনীতি করিনি। পদক দিলে বা নিলেই সম্মানিত হয়, এই দৃষ্টিভঙ্গিতে আমি বিশ্বাসী নই। তাঁর সহধর্মিণী আমিনা আহমদ বর্তমানে ন্যাপের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য এবং সভানেত্রী হিসেবে আছেন বাংলাদেশ নারী সমিতিতে। জাতীয় সংসদের সংরক্ষিত আসনে নবম ও দশম সংসদের সাংসদ নির্বাচিত হন।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *




পর্তুগাল বাংলানিউজ

প্রধান উপদেষ্টা: কাজল আহমেদ

পরিচালক: মোঃ কামাল হোসেন, মোঃ জহিরুল ইসলাম

প্রকাশক: মোঃ এনামুল হক

যোগাযোগ করুন

E-mail : portugalbanglanews24@gmail.com

Portugalbanglanews.com 2019
Developed by RKR BD