পর্তুগিজদের হাত থেকে শুরু, ১৫৩ বছরের পুরানো চট্টগ্রামের বেলা বিস্কুট

পর্তুগাল বাংলা নিউজপর্তুগাল বাংলা নিউজ
  প্রকাশিত হয়েছেঃ  ১২:০১ PM, ৩১ অক্টোবর ২০২৩

মেহজাবিন বশির তুলি- এই বেকারি ব্যাপকভাবে পরিচিতি লাভ করে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়ে। যুদ্ধ চলাকালে ব্রিটিশ সৈন্যদের জন্য খাবার হিসেবে রুটি নিয়ে আসা হতো এই ‘গণি বেকারি’ থেকেই। প্রতিদিন বিশাল সংখ্যক সৈন্যের জন্য রুটি তৈরি করতে হতো গণিকে। এত মানুষের জন্য যেসব কাঁচামাল দরকার হতো সেটি তখন ব্রিটিশরাই সরবরাহ করতো তাকে। 

“ষাটের দশকের এক সন্ধ্যার কথা। আব্বা অফিস থেকে বাসায় ফিরলেন অনেকগুলো বিস্কুটের প্যাকেট নিয়ে। প্যাকেটগুলো হাতে পেয়েই আমরা ভাই-বোন সবাই মিলে এমন আনন্দে মেতে উঠলাম, বাইরে থেকে দেখে যে কেউ ধারণা করে নেবে হয়তো খুব বড় কোনো উপহার পেয়ে গেছি। প্যাকেটগুলো নিয়ে আমাদের ভাইবোনের মধ্যে হতো কাড়াকাড়ি। আব্বাও আমাদের আনন্দ দেখে হাসেন। এরপর থেকে প্রায়ই তিনি সেই বিস্কুটের প্যাকেট নিয়ে বাসায় ফিরতেন। আমরা সকাল-সন্ধ্যায় সেই বিস্কুট চায়ে ডুবিয়ে খেতে খেতে আড্ডা দিতাম। গণি বেকারির সাথে আমাদের পরিচয় হয় এভাবে। আব্বা বেঁচে নেই অনেক বছর হলো। কিন্তু তার নিয়ে আসা সেই বিস্কুটের প্রতি রেশ রয়ে গেছে এখনও। তাই যখনই চট্টগ্রাম যাই, কয়েক প্যাকেট বিস্কুট নিয়ে আসি এই বেকারি থেকে”, গণির বিস্কুট নিয়ে এভাবেই স্মৃতিচারণ করছিলেন নাজমীনা হক। মুখে তার স্মিত হাসি। হয়তো সেই সময়টার আরও অনেক স্মৃতি মাথায় এসে জড়ো হচ্ছে একে একে।

গণি বেকারি নিয়ে ২২ বছর বয়সী আজিজুর রহমান সোহেল তার জমানো স্মৃতি নিয়ে কথা বলছিলেন টিবিএসের সাথে। তিনি বলেন- “আমরা সাতকানিয়ায় থাকতাম আর আব্বু টেরিবাজারে চাকরি করতেন। প্রতি শুক্রবার বাড়ি আসার সময় তিনি গণি বেকারি থেকে বেলা বিস্কুট নিয়ে আসতেন। এক প্যাকেটে ৫০ পিস বিস্কুট থাকতো তখন। কাগজের প্যাকেটেই বিক্রি হতো সব পণ্য। আব্বুর নিয়ে আসা সেই বিস্কুট সবচেয়ে বেশি পছন্দ করতেন দাদী এবং ফুফু। কিন্তু দাদী মারা যাওয়ার পর আব্বু এই বিস্কুট তেমন একটা নিয়ে আসেন না আর।”

মানুষের শৈশব-কৈশোরের অনেক গল্প এবং স্মৃতির সাথে সম্পৃক্ত এই বেকারি ব্যাপকভাবে পরিচিতি লাভ করে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়ে। যুদ্ধ চলাকালে ব্রিটিশ সৈন্যদের জন্য খাবার হিসেবে রুটি নিয়ে আসা হতো এই ‘গণি বেকারি’ থেকেই। প্রতিদিন বিশাল সংখ্যক সৈন্যের জন্য রুটি তৈরি করতে হতো গণিকে। এত মানুষের জন্য যেসব কাঁচামাল দরকার হতো সেটি তখন ব্রিটিশরাই সরবরাহ করতো তাকে। সে সময় থেকে শুরু করে এখন পর্যন্ত গণি বেকারি ক্রেতাদের নিকট এক আস্থার নাম।

ষাটোর্ধ্ব আবদুল আজিজ (ছদ্মনাম)। গাড়ি থেকে নেমে স্ত্রীকে সাথে নিয়ে প্রবেশ করলেন গণি বেকারির


Service médical à domicile de Medici Generici à Rome

Service médical à domicile de Medici Generici à Rome

Notre équipe fournit un service de soins de santé à domicile, garantissant professionnalisme et confort pour les patients à Rome.

অন্দরে। দোকানের কর্মচারীদের বিনয়ের সাথে বাক্য বিনিময় এবং আন্তরিকতা দেখে যে কেউ আঁচ করতে পারবেন তিনি গণির পণ্যের অনেক পুরাতন ক্রেতা। একসাথে কিনে নিলেন ৩ প্যাকেট বেলা, ২ প্যাকেট টোস্ট, ২ প্যাকেট পাউরুটি। প্রতিবার অনেকটা পথ পাড়ি দিয়ে এখান থেকেই নিয়ে যান নিজ পছন্দের পণ্য।

শুধু আবদুল আজিজই নন, এই বেকারির অন্দরে বিস্কুট কেনার উদ্দেশ্যে আগমন ঘটে বিভিন্ন বয়সী ক্রেতার। ৩০ ধরণের পণ্যের মধ্যে ক্রেতাদের পছন্দের শীর্ষে আছে বেলা বিস্কুট। প্রায় ৩ ধরণের বেলা পাওয়া যায় এখানে। বেলা, মাখন বেলা এবং রোজ বেলা। এদের মধ্যে মাখন বেলার দাম সর্বাধিক। ৩০ পিস মাখন বেলার দাম রাখা হয় ১৫০ টাকা, সাধারণ বেলা এবং রোজ বেলার দাম ১১০ টাকা পর্যন্ত হয়ে থাকে।

শীতল হাওয়ার ভোরবেলাতে ধোঁয়া ওঠা চায়ের কাপে বেলা বিস্কুট ডুবিয়ে খাওয়া যেন এখানকার সব মানুষের মধ্যে সৃষ্টি করে অন্যরকম প্রশান্তি। বর্তমানে বেলার সাথে যুক্ত হয়েছে মাখন বেলাও। চট্টগ্রামের মানুষের সাথে বেলা বিস্কুটের সম্পর্ক দীর্ঘদিনের।  কিন্তু এই বেলা বিস্কুট তৈরির যাত্রা শুরু হয় বেকারি প্রতিষ্ঠা হবার আরও আগে। ২০০ বছর আগে তৈরি হওয়া এই বিস্কুটকে বলা হয়ে থাকে উপমহাদেশের অন্যতম প্রাচীন বিস্কুট। বছরের পর বছর চট্টগ্রাম অঞ্চলের মানুষের মধ্যে প্রসার লাভ করা এই বিস্কুট জনপ্রিয়তা অর্জন করেছে দেশের অন্যান্য স্থানেও। গবেষকদের তথ্যানুসারে  আবদুল গণি সওদাগরের পূর্বপুরুষ লাল খাঁ সুবেদার ও তাঁর ছেলে কানু খাঁ মিস্ত্রির হাত ধরে বেকারি পণ্য তৈরির সূচনা  হয় চট্টগ্রামে। সে সময়ে এই এলাকায় প্রবেশ ঘটে পর্তুগিজদের। তাদের খাদ্যাভ্যাসে ছিল রুটি, পাউরুটি, বিস্কুটসহ নানা বেকারি পণ্য। প্রচলিত রয়েছে পর্তুগিজদের কাছ থেকে অনুপ্রাণিত হয়েই আবদুল গণি সওদাগর প্রথম বেলা বিস্কুটের প্রচলন ঘটিয়েছিলেন। তাদের এমন খাদ্যাভ্যাসের কারণে চট্টগ্রাম অঞ্চলে পুরোদমে শুরু হয় বেকারিশিল্পের যাত্রা।

ঐতিহ্যবাহী এই বেলা বিস্কুট এর গুণগান লক্ষ্য করা যায় বিভিন্ন লেখকের লেখনীতেও। কবি ও সাংবাদিক ওমর কায়সার তার লেখা আঞ্চলিক এক ছড়ায় নিজের অনুভূতি প্রকাশ করেন এভাবে-

“বেলা বিস্কুট গরম চা

মজা গরি ডুবাই খা

ঘরত গরবা আইস্যি

বেলা দেহি হাইস্যি।”

শুধু তাই নয়। ১৯৬৬ সালে প্রখ্যাত সাহিত্যিক আবুল ফজল রচিত আত্মজীবনী রেখাচিত্র গ্রন্থে দেখা মেলে বেলা নিয়ে স্মৃতিচারণ। তিনি লেখেন- ‘ঘুম থেকে উঠে পান্তাভাতের বদলে খাচ্ছি গরম-গরম চা বেলা কি কুকিজ নামক বিস্কুট দিয়ে। কুকিজ ইংরেজি নাম, বেলা কিন্তু খাস চাটগেঁয়ে।’ গণি বেকারীর বর্তমান মালিক আবদুল্লাহ মোহাম্মদ এহতেশাম বলেন, “আমাদের পণ্যের মধ্যে সবচেয়ে জনপ্রিয় হলো বেলা বিস্কুট । দিনে ২০০-২৫০ প্যাকেট বিস্কুট বিক্রি হয় আমাদের।”

ক্রেতাদের চাহিদা অনুযায়ী বেলা বিস্কুটের যোগান দিতে পারেন না অনেক সময়। কারণ হিসেবে তিনি উল্লেখ করেন বেকারির কেবল একটা শাখা হওয়ায় এই ঝামেলায় ভুগতে হয় তাদের। তাছাড়া বেলা বিস্কুট পুরোপুরি তৈরি করতে সময় লাগে ২ দিন। সময়সাপেক্ষ হওয়ার কারণেও যোগান বেশি দেওয়া সম্ভব হয় না বলেও জানান তিনি।

চার পুরুষের প্রজন্ম ধরে চলছে এই বেকারির কাজ : চট্টগ্রামের চন্দনপুরা এলাকায় এই বেকারির অবস্থান। বেকারির নাম অনুসারে এই এলাকায় একটি গলিও আছে। নাম ‘গণি বেকারী গলি’। চট্টগ্রামে বসবাসরত প্রায় সব মানুষেরই এই বেকারি নিয়ে আছে ভালো জানাশোনা। ১৫৩ বছর ধরে সম্মানের সাথে পরিচালিত হওয়া চার পুরুষের এই প্রতিষ্ঠানের বর্তমান কর্ণধার আবদুল্লাহ মোহাম্মদ এহতেশাম। বাবা জামাল উদ্দিনের কাছ থেকেই শিখে নেন বেকারির টুকটাক কাজ। জামাল উদ্দিন মারা যাওয়ার পর বেকারির এই গুরুদায়িত্ব নিজ কাঁধে তুলে নিয়েছেন তিনি।

এই বেকারির পণ্যের ইতিহাস শুরু হয়েছিলো গণির পূর্বপুরুষ লাল খাঁ সুবেদার এবং তার ছেলে কানু খাঁ মিস্ত্রির হাত ধরে। কিন্তু তখনো গণি বেকারির এত নামডাক ছিলো না। ১৮৭০ সালের দিকে এই যাত্রায় নাম লেখান আবদুল গণি সওদাগর। নিষ্ঠার সাথে দীর্ঘদিন পরিচালনা করেছেন এই বেকারির কার্যক্রম। ১৯৭০ সালে তিনি মারা যান। এই ঘটনার পর বেকারির দায়িত্ব নেন আবদুল গণির ভাইয়ের ছেলে দানু মিয়া সওদাগর। তার মৃত্যুর পরে জামাল উদ্দিন এবং পরবর্তীতে আবদুল্লাহ মোহাম্মদ এহতেশামের উপর অর্পিত হয় এই গুরুভার।

অতি প্রাচীন এই বেকারির নেই দ্বিতীয় কোনো শাখা। কেবল চট্টগ্রামের চন্দনপুরা এলাকায় কলেজ গলিতে ১৫৩ বছর আগে প্রতিষ্ঠিত প্রধান শাখার দেখা মেলে। আর কোনো শাখা চালু করার ইচ্ছা আছে কিনা এই প্রশ্নের উত্তরে এহতেশাম বলেন, “আমার বাবা করে গেছেন এই দোকান। এটাকে বাঁচিয়ে রাখা তো আমাদের দায়িত্ব। প্রফিট মেকিং নয়, শুধুমাত্র ঐতিহ্য ধরে রাখতেই এই দোকান এখনো চালিয়ে নিয়ে যাচ্ছি। যদি ব্যবসায়িক উদ্দেশ্যে করতাম তাহলে আজ এটার অনেক শাখা থাকতো।”

অনেকগুলো শাখা থাকার কুফলের কথাও উল্লেখ করেন তিনি। অন্যান্য জায়গায় এই বেকারির একাধিক শাখা খুলতে গেলে আগের মতো ভালো পণ্য দেওয়া হয়তো সম্ভব হবে না। এতে শাখা বৃদ্ধি পেলেও পণ্যের মান কমে যাবে। একটা শাখা হওয়াতে আগের স্বাদেই পণ্য দিতে পারেন বলেই পুরোনো ক্রেতারা এখনো ভিড় জমান এখানে। ক্রেতারা যে সন্তুষ্টির সাথে পণ্য ক্রয় করতে পারছে তখন হয়তো সেটা সম্ভব হতো না। এইসব চিন্তা মাথায় রেখেই দ্বিতীয় কোনো শাখা চালুর করার পরিকল্পনা কখনো কাজ করেনি বলে জানান তিনি।

আপনার মতামত লিখুন :