পর্তুগাল এজোরেস দ্বীপপুঞ্জে একদিন

পর্তুগাল এজোরেস দ্বীপপুঞ্জে একদিন

ইবেরিয়া (Iberia) পেনিনসুলার আটলান্টিক তীরবর্তী রাষ্ট্র পর্তুগালের রয়েছে এক গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস।  প্রায়  এক কোটি ত্রিশ লক্ষ জনসংখ্যার উত্তর পূর্ব আটলান্টিক তীরবর্তী এ ছোট্ট দেশটির রয়েছে সুদীর্ঘ স্বর্ণালী ইতিহাস । একসময় ছোট্ট এ দেশটি  বিশ্বের  অনেক দেশে উপনিবেশ সৃষ্টি করে তাদের শাসন করেছে।  আমাদের বাংলাদেশে ও একসময় পর্তুগিজ  কলোনি ছিল যার অনেক চিহ্ন এখনো এখানে বিদ্যমান।  সময়ের পরিক্রমায় আজ সেই পর্তুগালেই পারি  জমিয়েছে অনেক বাংলাদেশী, ধীরে ধীরে গড়ে তুলছে এখানে তাদের স্বপ্নের আবাসভূমি।   তাই পর্তুগালের লিসবন, পোর্তো, আলগ্রাভ ও অন্যান্য শহরে  দেখতে পাওয়া যায় হাজার হাজার বাংলাদেশিকে যারা এখানে খুঁজে পেয়েছে তাদের জীবন ও জীবিকা। 

দক্ষিণ পশ্চিম ইউরোপের তুলনামূলক উষ্ণ ও আরামদায়ক আবহাওয়ার এ সুন্দর এ দেশটিকে প্রকৃতি যেন নিজের হাতে সাজিয়ে রেখেছে সারা বিশ্বের লক্ষ লক্ষ পর্যটকের গন্তব্যস্থল হিসেবে।  তাইতো সারাবছর বিশ্বের বিভিন্ন জায়গা থেকে অগণিত পর্যটক  এ দেশটিতে  এসে  মেতে উঠে সৌন্দর্যের অবগাহনে।

আজ আমরা পর্তুগালের এমন এক পর্যটন কেন্দ্রের কথা বলবো যার সৌন্দর্য উপভোগ করতে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ছুতে আসে অগণিত ভ্রমণ পিয়াসী পর্যটক।  পর্তুগালে ভ্রমণের জন্য অনেক সুন্দর জায়গা থাকলে ও আমরা আজ আলোচনা করবো পর্তুগালের শাসনাধীন উত্তর আটলান্টিসের স্বায়ত্তশাসিত এজোরেস (Azores) দ্বীপপুঞ্জের কথা। এজোরেস দ্বীপপুঞ্জ হলো উত্তর অতলান্তিক এ অবস্থিত পর্তুগালের  একটি স্বায়ত্তশাসিত রাজ্য।  এ স্বশাসিত  অঞ্চলে রয়েছে ৯ টি ছোট বড়ো দ্বীপ।  মহাদেশীয় পর্তুগাল থেকে ১৩৬০ কিলোমিটার (৮৫০ মাইল) পশ্চিমে , লিসবন থেকে ১৬৪৩ কিলোমিটার (১০২১ মাইল ) পশ্চিমে, মরক্কো থেকে ১৫০৭ কিলোমিটার (৯৬৩ মাইল ) উত্তর-পশ্চিমে এবং কানাডার নিউফাউনলান্ড থেকে ১৯২৫ কিলোমিটার (১১৯৬ মাইল ) দক্ষিণপূর্বে অবস্থিত এ দ্বীপপুঞ্জ হলো একটি আগ্নেয় দ্বীপপুঞ্জ ।প্রকৃতির ওপর সৌন্দর্যের লীলাভূমি খ্যাত দ্বীপগুলো হলো সাও  মিগুয়েল , পিকো, তের্সেইরা, সাও জর্জ, ফাইয়াল, ফ্লোরেস, সান্তা  মারিয়া , গ্রাসিয়াস, এবং কার্ভো। এজোরেস দ্বীপুঞ্জের স্থলভাগে যেমন পাহাড় পর্বত, পাখি ও সবুজ বেষ্টিত ওপার সৌন্দর্যের আঁধার, তেমনি এর তীরবর্তী আটলান্টিকের বিস্তীর্ণ নীল জলরাশিতে রয়েছে তিমি, ডলফিন, বিভিন্ন সামুদ্রিক প্রাণী, ও সমুদ্রের ওপর সোন্দর্জ উপভোগের এক নিশ্চিত হাতছানি। 

দিনটি ২০১৯ সালের মে মাসের ৮ তারিখ।  সাটা এজোরেস  এয়ারলাইন্স এ লিসবন টু হোর্তা (ফাইল) যাওয়ার টিকেট বুকিং দিলাম।  সে অনুযায়ী সকাল ৮ টাই লিসবন থেকে হর্তা বিমান বন্দরের উদ্দেশে  বিমানে চড়ার জন্য যথা সময়ে বিমান বন্দরে হাজির হলাম।  কিন্তু খারাপ আবহাওয়ার কারণে আমাদের সেই ফ্লাইট টি বাতিল হয়ে যাইও এবং কর্তৃপক্ষ ঘোষণা দিলো যে বিকাল ৩ তাই তাদের আর একটি ফ্লাইট লিসবন থেকে পিক আইল্যান্ড এর উদ্দেশে ছেড়ে যাবে।  যারা আগ্রহী তারা চাইলে সেই ফ্লাইট এ তাদের ইতিনেরই পরিবর্তন করে নিতে পারে।  সে ক্ষেত্রে পিক আইল্যান্ড এ পৌঁছানোর পর কর্তৃপক্ষ আমাদের ফেরিতে করে ২০/২৫ মিনিট এ পিক থেকে হোর্তাই পৌঁছে দিবে।  উল্লেখ্য যে হোর্তা(ফাইল) ও পিক আইল্যান্ড আর দূরত্ব খুবই কম এবং এক ডিপ থেকে আর এক দ্বীপে ফেরিতে করে যেতে ২০/২৫ মিনিট লাগে।  তাই আমি সে সুযোগ অর্থাৎ এক সাথে তুই দ্বীপের সোন্দর্য্য উপভোগ করার সুযোগ হাতছাড়া করতে চাইনি।  তাই রাজি হয়ে গেলাম।

কিন্তু বিধি বাম।  আবহাওয়া এখানে ও আগের মতোই।  তাই সেই ফ্লাইটি ও বাতিল।  কর্তৃপক্ষ আমাদের হয় ফ্লাইট বাতিল করার অনুরোধ করলো না হয় পরের দিনের সকাল  ৮ টার হোর্তার ফ্লাইট ধরতে বললো। সে ক্ষেত্রে যারা আগামী কাল ফ্লাইট ধরবে তাদের হোটেল এ রাত্রি যাপনের ব্যবস্থা করে দিলো।  আমার বাসা লিসবনে হওয়াতে আমি হোটেলে না উঠে বাসায় চলে গেলাম।  পরের দিন যথা সময়ে বিমান বন্দরe চলে এলাম।  আজও কিন্তু হোর্তার আবহাওয়া খারাপ দেখাচ্ছে।  তাই যথারীতি দেরি হচ্ছিলো।  অবশেষে ১ ঘন্টা পরে ঘোশণা আসলো যে প্লেন  হোর্তার উদ্দেশে উড়াল দেবে।  তাই খুশিতে আত্মহারা।  প্রায় সকাল নেতা বাজে প্লেন আমাদের নিয়ে সেই বহু কাঙ্খিত এজোরেস এর উদ্দেশে রওনা করলো।  বিমান উড়তে লাগলো আটলান্টিকের নীল জলরাশির উপর দিয়ে।  হারিয়ে যাচ্ছিলাম রোমাঞ্চকর এক সপ্নীল জগতে।  এভাবে আটলান্টিক জলরাশি আর ধবল মেঘের রোমাঞ্চকর এক সপ্নীল জগৎ পারি দিয়ে প্রায় তিন ঘন্টা পর উড়োজাহাজটি আমাদের নিয়ে এজোরেস অঞ্চলে প্রবেশ করার সাথে সাথে যেন পেতে শুরু করলাম ভ্রমণের এক ভিন্ন অভিজ্ঞতা।  যে দিকে চোখ যাই, এজোরেস এর ডিপ গুলোর সবুজের হাতছানি, উঁচু পাহাড়ের উষ্ণ অভিবাদন আর এজোরেস এর সাথে আটলান্টিকের স্বপ্নের জলকেলী।  বিমান ল্যান্ড করার আগে আমার চিরাচরিত অভ্যাসের কিছু ছবি ও ভিডিও ইতিমধ্যে আমার মুঠোফোনকে পূর্ণ করে ফেলেছে। অবশেষে আমরা হোর্তা বিমান বন্দরে ল্যান্ড করলাম। 

বিমান বন্দর থেকে বের হয়ে আমি, বাংলাদেশী এনাম ভাই এবং এক নেপালি বন্ধু মিলে একটা ট্যাক্সি নিয়ে রওনা হলাম হোর্তার কোন্দ্রস্থলের দিকে।  সেখানে গিয়ে আমার হোটেল রুম এ উঠলাম।  রুম থেকে বের হয়ে দেখতে লাগলাম দ্বীপটির ওপর সৌন্দর্য। সারা দিন ঘুরলাম দ্বীপের মারিনা, সমুদ্র তীর এবং আরো অনেক জায়গা। পরের দিন সকালে আমরা দীপ্তির সর্বোচ্চ শৃঙ্গ কেবেঁকে গোরদো (1043 meter) পরিদর্শনের উদ্দেশ্যে একটি ট্যাক্সি ভাড়া করি।  ট্যাক্সি নিয়ে প্রায় ২০ মিনিট এ আমরা সেই শৃঙ্গে পৌঁছে যাই।  গোটা ফাইল দ্বীপ ও পিকো আইল্যান্ড কে সেখান থেকে দেখে মনে হচ্ছিলো যেন আটলান্টিকের মাজখানে বিছিয়ে দেয়া সবুজের নিপুন কারুকাজ। এখান থেকে সর্বশেষ  ১৯৫৮ সালে আগ্নেয়গিরির অগ্নুৎপাত হয়।  দূরের পিকো আইল্যান্ড এর সর্বোচ্চ শৃঙ্গ মাউন্ট পিকার সাথে সাদা মেঘের কুন্ডলি ও এর আলিঙ্গনের সে এক অভূতপূর্ব দৃশ্য যা সকল প্রকৃতিপ্রেমী ও ভ্রমণপিয়াসুকে সেখানে টেনে নিয়ে যাবে বারংবার।  মাউন্ট পিকো হলো আটলান্টিকের পিক আইল্যান্ড এ অবস্থিত পর্তুগালের সর্বোচ্চ শৃঙ্গ যার উচ্চতা ২৩৫১ মিটার।  এখান থেকে সর্বশেষ ১৭২০ সালে আগ্নেয়গিরির অগ্নুৎপাত হয়।   হোর্তা  বা এজোরেস আর অন্য যেকোনো দ্বীপে গেলে আপনি ভালো আবহাওয়া সাপেক্ষে চলে যেতে পারেন আটলান্টিকের নীল জলরাশিতে।  সেখানে আপনি নিতে পারবেন নীল তিমি, ডলফিন ও সামুদ্রিক প্রাণী দেখার দুর্লভ  অভিজ্ঞতা।  এজন্য আপনাকে সাহায্য নিতে হবে সেখানকার কিছু প্রতিষ্ঠানের যারা স্পিড বোটের মাধ্যমে এসব ৫০ থেকে ৬০ ইউরো তে এ প্রোগ্রামের ব্যবস্থা করে থেকে।  দুৰ্ভাগ্যবসত খারাপ আবহাওয়ার কারণে আমার সে দুর্লভ অভিজ্ঞতা নেওয়ার সুযোগ হয়নি।  তবে এরপর ও এজোরেস ভ্রমণ যেন আমার জীবনে হয়ে আছে আমার ভ্রমণ পিয়াসু জীবনের এক মাইলফলক।  তাই ভ্রমণ বিলাসী বন্ধুদের জন্য পরামর্শ থাকবে যে পর্তুগাল বা ইউরোপে আসলে এজোরেস এ যেতে ভুলবেননা। 

কিভাবে যাবেন? এজোরেস দ্বীপের প্রতিটি দ্বীপে এক বা একাধিক বিমানবন্দর রয়েছে। বিমানবন্দরগুলো হলো করভো এয়ারপোর্ট, ফ্লোরেস এয়ারপোর্ট, গ্রাসিয়াস এয়ারপোর্ট, হোর্তা  এয়ারপোর্ট, জাও পাওলো এয়ারপোর্ট,, লাজেস ফিল্ড, লাজেস এয়ারপোর্ট, পিকো এয়ারপোর্ট, সান্তা মারিয়া এয়ারপোর্ট (এজোরেস), এবং  সাও জর্জ এয়ারপোর্ট। প্রতিটি দ্বীপের মধ্যে রয়েছে ভ্রমণের ভিন্ন অভিজ্ঞতা। রয়েছে সৌন্দর্যের বিচিত্রতা।  তাই আপনি চাইলে চলে যেতে পারেন আপনার পছন্দের যে কোনো দ্বীপে। পর্তুগাল বা ইউরোপের যেকোনো  বিমানবন্দর যেখান থেকে এজোরেস দ্বীপের বিমানবন্দরগুলোতে ফ্লাইট আছে সেখান থেকে উড়াল দিতে পারেনযদি আপনার পর্তুগাল বা কোনো সেনজেন দেশের ভিসা থাকে। পর্তুগালের তিনটি প্রধান বিমান বন্দর যেখান থেকে আপনি এজোরেস যেতে পারেন সেগুলো হলো লিসবন এয়ারপোর্ট, পোর্তো এয়ারপোর্ট, এবং ফারো এয়ারপোর্ট। তাই এখনই দেরি না করে বেরিয়ে পড়ুন।  আটলান্টিক  আর এজোরেস ডাকছে আপনাকে নীল সমুদ্রের জলকেলির জন্য।

ঘুড়ে এসে লিখেছেন : মুহাম্মদ আব্দুর রহিম, কান্ট্রি ম্যানেজার ব্র্যাক সাজন এক্সচেইন্জ লিমিটেড, পর্তুগাল।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *




পর্তুগাল বাংলানিউজ

প্রধান উপদেষ্টা: কাজল আহমেদ

পরিচালক: মোঃ কামাল হোসেন, মোঃ জহিরুল ইসলাম

প্রকাশক: মোঃ এনামুল হক

যোগাযোগ করুন

E-mail : portugalbanglanews24@gmail.com

Portugalbanglanews.com 2019
Developed by RKR BD