অসহায়ের পাশে দাঁড়ানোর গল্প

অসহায়ের পাশে দাঁড়ানোর গল্প

নিজস্ব প্রতিবেদক

সকালে ঘুম থেকে উঠতে একটু দেরী হওয়ায় নাস্তা না করেই ব্যক্তিগত একটা কাজ সেরে ১১ টায় চলে যাই শাহজাহানপুর। সেখান থেকে বন্ধু ফাইজুলকে নিয়ে গুলশানে এক বড় ভাই এর অফিসে উনার সাথে একটা জরুরি মিটিং এ এটেন্ড করার কথা। কিন্তু রওনা হতে গিয়ে নিশ্চিত হলাম মিটিং টাইম পরিবর্তন করা হয়েছে। সময় পরে জানানো হবে। কি আর করবো? যেহেতু মিটিং আপাতত ক্যানসেল হয়ে গিয়েছে তাই তৎক্ষনাৎ সিদ্ধান্ত নিলাম দুজন মিলে কোথাও বসে সাংগঠনিক ব্যাপারে কিছু পরিকল্পনা প্রনয়ণ করে রাখি। যেগুলো এখনো করা হয়নি সময়ের অভাবে। দীর্ঘ ৪ ঘন্টা বিভিন্ন বিষয়ে আলাপচারিতার পর মনে হলো যে দুপুরের লাঞ্চ টাইম অভার হয়ে গিয়েছে আরো অনেক আগেই। তাই বিদায় নিলাম বাসায় গিয়ে লাঞ্চ করবো বলে। আমার বাসা বাসাবো তে আর ফাইজুল থাকে শাহজাহানপুর কলোনি তে। ওকে ওর বাসার নিচে বিদায় দিয়ে আমি চললাম আমার গন্তব্যে। বাসাবো যেতে হলে আমাকে শাহজাহানপুর থানা ও একটা অভার ব্রিজ ক্রস করে যেতে হয়।

আমি যখন শাহজাহানপুর থানা ক্রস করে প্রায় ব্রিজের কাছাকাছি চলে আসছি তখন হঠাৎ চোখ পড়লো রাস্তার অপর প্রান্তে। দেখি ১১/১২ বছরের একটা ছেলে মুখে হাত চাপা দিয়ে বসে বসে কাঁদছে। মুখ থেকে অঝোর ধারায় রক্ত ঝড়ছে। আমি এগিয়ে গেলাম তার সামনে। আমার মত এমন আরো অনেকেই সেখানে ভীড় জমাচ্ছে। কিছুক্ষণ দেখে তারা আবার চলেও যাচ্ছে। আমি ছেলেটির অবস্থা দেখে কিছুক্ষণের জন্য কোথাও যেনো হারিয়ে গেলাম। নিরবতা ভেঙে তার সমস্যার কথা জানতে চাইলাম, নাম জানতে চাইলাম, বাড়ি কই তাও জানতে চাইলাম বাট সে প্রশ্নের উত্তরে কিছুই বলছে না। তার রেসপন্স নেই। আমার আগ্রহ দেখে পাশের এক দোকানী আন্টি এগিয়ে আসলেন, সে জানালো ছেলেটি কিছুক্ষণ আগে ট্রেন থেকে পড়ে গিয়ে এক্সিডেন করে, এতে তার সামনে দাঁত গুলো ভেঙে যায় মাড়ি সহ। তাই সে কথা বলতে পারছে না। আন্টি এটাও জানালো যে এতক্ষণ হয়ে যাচ্ছে লোকজন আসছে যাচ্ছে, কিন্তু কেউ এর চিকিৎসার ব্যবস্থা নিতে এগিয়ে আসছে না। আমিও খেয়াল করলাম একাধিক চাকুরীজীবি কোট-শুট পরা সাহেবেরা এবং সামর্থ্যবান ধনাঢ্য ব্যক্তিরা এক নজর দেখে কিংবা না দেখার ভান ধরেই এড়িয়ে যাচ্ছেন, এগিয়ে আসছেন না কেউ। আবার কেউ কেউ তাকে উদ্দেশ্য এমনও বলছে এদের জন্মের কোন ঠিক নেই। এগুলো মরে না কেন? এগুলো এভাবেই পথে ঘাটে মরা উচিত। বিশ্বাস করুন কথা শুনে মাথায় রক্ত উঠে যাচ্ছিল। কিন্তু চেয়েও কিছু বলতে পারছি না। পরক্ষণে আমি সিদ্ধান্ত নিলাম এর চিকিৎসার ব্যবস্থা আমিই নিবো। কথাটা আন্টিকে জানাতেই অপলক দৃষ্টিতে কিছুক্ষন চেয়ে রইলেন আমার দিকে। বললেন বাবারে এতক্ষণ যাবত এতগুলো মানুষকে রিকোয়েস্ট করলাম কেউ আসলো শেষে তুমিই আসলে? দেখে তো মনে হচ্ছে ছাত্র, পারবে? আমি বললাম অবশ্যই পারবো আন্টি, আমাকে পারতেই হবে আর এই ছেলেটির পাশে দাঁড়ানো আমাদের নৈতিক, মানবিক ও সামাজিক দায়িত্বও বটে। আমি সাথে সাথে ফোন দিলাম বন্ধু ফাইজুলকে। সে জানালো মাত্র খেতে বসে কয়েক লোকমা মুখে দিয়েছে।

আমি বললাম প্লেটটা ওভাবে রেখেই দ্রুত বের হয়ে আয় থানার একটু সামনে। সাথে সাথে ফোন দিলাম কাছের এক ছোট ভাই শুভ কে, জানতে চাইলাম কই আছো? সে জানালো খিলগাঁও, তাকেও বললাম থানার সামনে আসো। টাইম জানতে চাইলাম কতক্ষণ লাগবে? সে বললো ভাই ৫ মিনিট, তাকেও দ্রুত আসার তাগিদ দিয়ে বললাম ২ মিনিটের মধ্যে আসতে। আমার ফোন পেয়ে মূহুর্তের মধ্যে ওরা এসে হাজির। বললাম ছেলেটিকে দ্রুত ঢাকা মেডিকেল নিয়ে যেতে হবে। একটা রিকশার বন্দোবস্ত করতে করো। আমরা রিকশা ওয়ালাদের জিগ্যেস করতেই কেউ রাজি হচ্ছে না। যেখানে মানবিকতার বিষয়, খুব সহজেই তাদের যাওয়ার কথা সেখানে তারা পুরো উল্টো। কত ভাবে আকুতি মিনতি করলাম বাট কোন কাজই হলো না, কাউকেই রাজি করাতে পারিনি। এদিকে ছেলেটির মুখ থেকে এত পরিমাণ রক্ত ঝড়ছে যে, সে যেখানে বসা ছিল সেখান থেকে রক্ত গড়িয়ে অনেক টা জায়গা ভিজে গিয়েছে। তাই আমি আর ফাইজুল ওকে আমাদের দুই কাঁধে ভর করে সামনে এগুতে লাগলাম। যদি রিকশা পাই সেই আশায়। এদিকে আন্টি কিছু টাকা হাতে গুজে দিয়ে বললেন এটা নাও। কাজে লাগবে। মাথায় হাত দিয়ে দোয়া করে আমাদের বিদায় দিলেন। এটাও বললেন পরে যেন উনার সাথে দেখা করে সার্বিক বিষয় গুলো জানাই। (বলে রাখা ভালো যে আমরা ওই দিনের সকল কার্যক্রম পরিপূর্ণ শেষ করে রাত ১২ কি সাড়ে ১২ টায় আন্টির সঙ্গে দেখা করে সব ডিটেইলস শেয়ার করেছিলাম, এতে আন্টি আমাদের কি পরিমাণ খুশি হয়েছেন তা ভাষায় প্রকাশ করা সম্ভব নয়।) আমরা কিছু পথ হেঁটে যেতেই দেখি আরো একটি রিকশা আসছে। উনাকে বলায় উনিও রাজি না। পরে জোড়াজুড়ি ও ভাড়া বাড়িয়ে দেওয়ার আশ্বাসে রাজি হলেন। এর মধ্যে ফাইজুল ফোন দিলো ওর বন্ধু ইমরান কে। সে আসবে তাই রিকোয়েস্ট ওর অপেক্ষায় যেনো আমরা সামনে একটু রিকশা থামিয়ে দাঁড়াই। কিছুক্ষণের মধ্যে দেখি এখানে বেশ উৎসুক জনতার ভীড় জমে গিয়েছে। সকলের অসংখ্য প্রশ্নে বিরক্ত হয়ে গিয়েছি আমরা। এরই মধ্যে কয়েকজন জ্ঞান দিতে শুরু করলেন- তোমাদের খেয়ে দেয়ে কোন কাজ নেই? এই ছেলেকে নিয়ে গেলে তোমরা ফেঁসে যাবা, পুলিশ বলবে তোমার মেরে তারপর ওকে মেডিকেল নিয়ে আসছো, এর পরিচয় জানো না, ঠিকানা জানো না, এসব ছাড়া চিকিৎসা হয় নাকি? এসব ছেলে পেলে রাস্তা ঘাটে থাকে, এরা প্রতিদিন এমন এক্সিডেন করে আবার এমনিতেই ঠিক হয়ে যায়, তোমাদের এসব ঝামেলায় ঝড়ানোর প্রয়োজন নেই, আইনটি জটিলতায় ফেঁসে যাবা। আমাদের কথা হলো- আরে ভাই আগে আইন না মানবতা? মানুষ না বাঁচলে আইন কার জন্যে?

মানবিক কাজ নিজে না করুন অন্য কে নিরুৎসাহিত করেন কেন? নিজে ফেঁসে গিয়ে যদি অন্যের বিন্দু মাত্র উপকার হয় তবে আমি একবার নয় শতসহস্র বার ফেঁসে যেয়েও উপকার করতে রাজি আছি। নিজের জীবন বিপন্ন করে হলেও চাই ভালো থাকুক অন্যরা। দীর্ঘ জ্যাম পেরিয়ে সন্ধ্যায় পৌঁছে গেলাম ঢাকা মেডিকেল। টিকিট কাটার আগে জানতে চাইলাম তার নাম (যেহেতু কাউন্টারে বলতে হবে তাই), কথা বলতে পারে না তবুও সে বহু কষ্ট করে জানালো তার নাম হৃদয়। বয়স আমরা আনুমানিক দিয়ে নিয়ে আসলাম টিকেট। কোন সমস্যা হয়নি আলহামদুলিল্লাহ।

বহু খুঁজাখুঁজির পর বের করলাম টিকিটের সাজেস্ট কৃত ডাক্তারের চেম্বার। খুব লম্বা সিরিয়াল কিন্তু ডাক্তার নেই। উনি নামাজের ব্রেকে গিয়েছেন। সরকারি হাসপাতাল, বুঝেনই তো! একটু দেরি করে হলেও উনি আসলেন। আমরাও দাঁড়িয়ে ছিলাম সিরিয়ালে। কিন্তু সামনে থাকা কিছু ভালো মানুষ (রোগীদের) ব্যবহারে খুব অবাক হলাম। যেখানে এসব সিচুয়েশনে কেউ কারো আগে যেতে দেয়না কিংবা দাঁড়ানোর সুযোগ নেই সেখানে আমাদের রোগীর অবস্থা দেখে সবাই জোর করে সবার আগেই ডাক্তারের রুমে যেতে দিলেন। যা ওই সময় ছিল অনেক বড় পাওয়া কেননা তখন দ্রুততম সময়ে ডাক্তারের শরণাপন্ন হওয়া ছিল আমাদের জন্য জরুরি। অপেক্ষা করলে হয়তো অনেক সময় লেগে যেতো। তাদের এই মূল্যবান ত্যাগের কথা আমি মনে রাখবো সবসময়। ডাক্তার লাইট নিয়ে তার মুখের ভিতর ভালো করে পরীক্ষা করে দেখেন তার অনেক গুলো দাঁত ভেঙে মাড়ি সহ ভিতরে চলে গিয়েছে। ঠোঁট কেটে গিয়েছে। উনি আমাদের একটি মুখ ওয়াশ করার একটি ঔষধের নাম লিখে দিয়ে অন্য আরেক ডাক্তারের কাছে যেতে বললেন। কাগজে তা লিখে স্বাক্ষরও করে দিলেন। তবে এটাও বলে দিলেন ঐ ডাক্তারের ওখানে কাজ শেষ হলে পুনরায় উনার সাথে দেখা করে যেতে। আমরা বাহির থেকে অনেক খুঁজাখুঁজি করে ঔষধ নিয়ে চলে গেলাম পরবর্তী ডাক্তারের কাছে। সেখানে গিয়ে অনেক বেশি হয়রানি হতে হয়েছে। ২ ঘন্টা পর ডাক্তার আমাদের ডাকলেন। আমরা ভিতরে গেলাম। ঔষধ আর কাগজ উনার হাতে দিলাম। উনি তাকে অপারেশন বেডে শুতে বললেন। হৃদয় ছেলোটি ডাক্তারের যন্ত্রপাতি দেখে ভয় পেয়ে গেলো। তাকে অনেক বুঝিয়ে, অভয় দিয়ে শুয়ালাম বেডে। সে বার বার ইশারা ইঙ্গিতে বলছে ইনজেকশন কে সে অনেক ভয় পায়। আমরা তাকে বললাম ভয়ের কিছুই নেই। তুমি চিন্তা করো। কিছুই হবে না। আমরা আছি তোমার সাথে। সে আমাদের হাত চেপে ধরে রাখলো যেনো চলে না যাই।

ডাক্তার ঔষধ দিয়ে তার মুখ ওয়াশ করে, ছোট্ট একটা ইনজেকশন দিয়ে তাকে অবশ করে ঠোঁট সেলাই করলেন। মুখের ভিতরও অন্যান্য ট্রিটমেন্ট গুলোও সম্পন্ন করলেন ভালো ভাবেই। আমরা আবারো পূর্বের ডাক্তারের নিকট ফিরে গেলাম। উনি সব কিছু চেক করে এক গাদা ঔষধ লিখে দিলেন। আমরা উনার অনুমতি সাপেক্ষে কয়েকটি ছবি নিলাম। সব শেষ করে বিদায় নিলাম অসংখ্য মানুষের সুস্থ হওয়ার অনন্য কেন্দ্র ঢাকা মেডিকেল থেকে। আমাদের এলাকায় আসতে বেজে যায় রাত ১১ টা। চিকিৎসা পর্ব তো শেষ। এখন চিন্তা হচ্ছে এই ভেবে যে মেডিসিন/ঔষধ গুলো না হয় আমরা ব্যবস্থা করে দিবো কিন্তু সে/হৃদয় থাকবে কই? এখন তার পর্যাপ্ত পরিমাণ বিশ্রাম ও খাদ্য প্রয়োজন। কিন্তু ওর ভালো কোন থাকার জায়গা নেই। এতদিন সে থাকতো বিভিন্ন স্টেশনে স্টেশনে। মানুষের মালামাল টেনে যা পেত তা দিয়ে ১/২ বেলা এটা সেটা খেয়ে কাটিয়ে দিতো। তার আধা-আধা বক্তব্যে সে আমাদের জানায় লাস্ট এক মাসে গোছল করেছে ৩ বার। ২০ টাকা দিয়ে কোথা থেকে যেন গোছল করা যায়। ১ কাপড়েই ঘুরে বেড়ায়। ঘর ছাড়া হয়েছে ১ দের মাস আগে। বাড়ি সিলেট। তাকে বললাম চলো দেখি তোমার এলাকায় কারা আছে আমরা যোগাযোগ করে তাদের কাছে দিয়ে আসি কিন্তু সে যেতে কোনভাবেই রাজি নয়। কোন সমাধান হচ্ছে না। আমরা আরো চিন্তায় পড়ে গেলাম। এই রাত্রেই তাকে নিয়ে গেলাম শাহজাহানপুর থানায়। সেখানে বিস্তারিত বলতে তারা জানালো যেহেতু ছেলেটি ট্রেন থেকে পড়ে এক্সিডেন করেছে সেহেতু এটা রেলওয়ে থানার সাথে যোগাযোগ করলে বেশি ভালো হয়। তারা ভালো সমাধান দিতে পারবেন। আমরা দেরী না করে তখনই চলে গেলাম ঢাকা রেলওয়ে থানায়।

আমরা সরাসরি ওসি স্যারের সাথে ফেস টু ফেস পুরো ঘটনা খুলি বলি। এবং আবেদন করি যেন তার একটা ব্যবস্থা করা হয়, স্যার প্রথমে রাজি না হলেও পরে আমাদের লিখিত রেফারেন্সে তার স্থায়ী ভাবে থাকা, খাওয়া ও ভরন-পোষণের ব্যবস্থা করে দেন। উনাদের নির্দিষ্ট পূনর্বাসন কেন্দ্রে তাকে পাঠানোর সাধারন পক্রিয়া গুলো শেষ করেই আমাদের বিদায় দেন। আমরা স্যারের অনুমতি সাপেক্ষে ১ টি ছবি নিয়ে এবং হৃদয় কে কিছু দিকনির্দেশনা দিয়ে চলে আসি ওখান থেকে। আমরা যখন চলে আসছি তখন সে আমাদের কে বারবার দেখছিলো। তার অপলক দৃষ্টি যেনো বলছে, কে বলেছে আমার কেউ নেই, আমার বিপদে যারা এই সহায়তা টুকু করেছে তারাই তো আমার স্বজন-আপনজন। আমরাও চাই এভাবে প্রতিনিয়ত অসহায় মানুষের বিপদে স্বজন হয়ে পাশে দাঁড়াতে। এতে আপনাদের সহযোগিতা, দোয়া ও ভালোবাসা কাম্য। ভালো থাকুক, সুস্থ থাকুক পৃথিবীর সকল মানুষ গুলো।

লেখা- এ.জে.এম. সানজিদ ফরাজী প্রতিষ্ঠাতা, ট্রিটমেন্ট ফাউন্ডেশন।

pbnews/nk

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *




পর্তুগাল বাংলানিউজ

প্রধান উপদেষ্টা: কাজল আহমেদ

পরিচালক: মোঃ কামাল হোসেন, মোঃ জহিরুল ইসলাম

প্রকাশক: মোঃ এনামুল হক

যোগাযোগ করুন

E-mail : portugalbanglanews24@gmail.com

Portugalbanglanews.com 2019
Developed by RKR BD